দক্ষিণ কোরিয়ায় বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রফেসর-ফান্ডেড স্কলারশিপ (গ্র্যাজুয়েট/মাস্টার্স ও পিএইচডি লেভেল) গাইডলাইন
প্রফেসর-ফান্ডেড স্কলারশিপ (যাকে ল্যাব স্কলারশিপ, প্রজেক্ট-বেসড ফান্ডিং বা রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্টশিপও বলা হয়) দক্ষিণ কোরিয়ায় আন্তর্জাতিক গ্র্যাজুয়েট ও পিএইচডি শিক্ষার্থীদের জন্য টিউশন-ফ্রি বা আর্থিক সহায়তা পাওয়ার একটি সাধারণ উপায়। এটি সরকারি স্কলারশিপ যেমন গ্লোবাল কোরিয়া স্কলারশিপ (GKS) বা KOICA-এর মতো নয়; বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসররা তাদের রিসার্চ গ্রান্ট (যেমন ন্যাশনাল রিসার্চ ফাউন্ডেশন অফ কোরিয়া - NRF বা ইন্ডাস্ট্রি প্রজেক্ট থেকে) দিয়ে সরাসরি ফান্ডিং প্রদান করেন। এটি বিশেষ করে STEM (সায়েন্স, টেকনোলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং, ম্যাথমেটিক্স) বিষয়ে বেশি পাওয়া যায়, তবে অন্যান্য বিষয়েও (সোশ্যাল সায়েন্স, হিউম্যানিটিজ) প্রফেসরের ফান্ডিং থাকলে সম্ভব।
এই স্কলারশিপের মাধ্যমে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীরা মাস্টার্স, ইন্টিগ্রেটেড এমএস-পিএইচডি বা পিএইচডি প্রোগ্রামে পড়তে পারেন এবং প্রফেসরের ল্যাবে রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট (RA) হিসেবে কাজ করেন। ফান্ডিং সাধারণত সম্পূর্ণ বা আংশিক টিউশন কভার করে, মাসিক স্টাইপেন্ড (প্রায় ৮০০,০০০–২,০০০,০০০ কোরিয়ান ওয়ান, অর্থাৎ বাংলাদেশী টাকায় ৭০,০০০–১,৭০,০০০ টাকা), হেলথ ইনস্যুরেন্স এবং কখনো কখনো থাকা-খাওয়া বা রিসার্চ খরচ কভার করে। এটি খুবই প্রতিযোগিতামূলক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনের আগে প্রফেসরের সরাসরি অনুমোদন প্রয়োজন।
২০২৬ সালের জানুয়ারি ৩১ তারিখ অনুযায়ী, ফল ২০২৬ ইনটেকের জন্য অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন চলছে বা শীঘ্রই শুরু হবে। বাংলাদেশী শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক আবেদনকারী হিসেবে সম্পূর্ণ যোগ্য; প্রফেসর-ফান্ডেড পজিশনে কোনো নির্দিষ্ট জাতীয়তার সীমাবদ্ধতা নেই (তবে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ডেভেলপিং কান্ট্রি যেমন বাংলাদেশ থেকে শিক্ষার্থীদের ডাইভার্সিটির জন্য প্রায়োরিটি দেয়)।
মূল যোগ্যতার শর্তসমূহ
- জাতীয়তা ও বয়স: বাংলাদেশী নাগরিক হতে হবে (কোরিয়ান নয়)। মাস্টার্স/পিএইচডির জন্য সাধারণত ৪০ বছরের নিচে হওয়া ভালো।
- শিক্ষাগত যোগ্যতা:
- মাস্টার্সের জন্য: স্ট্রং GPA সহ ব্যাচেলর ডিগ্রি (সাধারণত ৩.০/৪.০ বা ৮০% সমতুল্য)।
- পিএইচডির জন্য: রিসার্চ অভিজ্ঞতা সহ মাস্টার্স ডিগ্রি; ইন্টিগ্রেটেড এমএস-পিএইচডি প্রোগ্রামে ব্যাচেলর ধারকরাও আবেদন করতে পারেন।
- প্রফেসরের রিসার্চ ফিল্ডের সাথে মিল থাকা জরুরি (যেমন ইঞ্জিনিয়ারিং, বায়োটেক, এআই)।
- ভাষার দক্ষতা: ইংরেজি (TOEFL/IELTS) বা কোরিয়ান (TOPIK লেভেল ৩+)। অনেক ল্যাবে ইংরেজি ব্যবহার হয়, বিশেষ করে শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে।
- অন্যান্য শর্ত: ভালো স্বাস্থ্য, কোনো ক্রিমিনাল রেকর্ড নেই। পূর্বের রিসার্চ অভিজ্ঞতা (পাবলিকেশন, প্রজেক্ট) সুবিধা দেয়। প্রফেসর চাইলে IELTS/TOEFL ছাড় দিতে পারেন।
- ভিসা: অ্যাকসেপ্টেন্স পেলে D-2 স্টুডেন্ট ভিসার জন্য আবেদন করতে হবে; প্রফেসরের ফান্ডিং লেটার সাহায্য করে।
বাংলাদেশের পাবলিক ইউনিভার্সিটি (যেমন BUET, DU) থেকে আসা STEM শিক্ষার্থীরা প্রায়ই সফল হন।
ধাপে ধাপে আবেদন প্রক্রিয়া
১. বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রফেসর রিসার্চ করুন (১-৩ মাস প্রস্তুতি):
- ফোকাস করুন শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে: Seoul National University (SNU), KAIST, POSTECH, Korea University, Yonsei University, Hanyang University, Sungkyunkwan University (SKKU), UNIST, Chungnam National University।
- বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে যান (কোরিয়ান পেজ গুগল ট্রান্সলেট করুন)। ডিপার্টমেন্ট পেজে (যেমন KAIST-এর Electrical Engineering) ফ্যাকাল্টি লিস্ট দেখুন।
- প্রফেসর খুঁজুন: গুগল স্কলার বা ResearchGate-এ আপনার ফিল্ড + “lab” + বিশ্ববিদ্যালয় নাম সার্চ করুন। তাদের পাবলিকেশন, ফান্ডিং সোর্স (NRF প্রজেক্ট) ও ল্যাব ওয়েবসাইট চেক করুন।
- ৫০-২০০ জন প্রফেসরকে টার্গেট করুন; যাদের অ্যাকটিভ গ্রান্ট ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী আছে তাদের প্রায়োরিটি দিন।
২. আবেদনের ডকুমেন্টস প্রস্তুত করুন:
- CV/রেজুমে: একাডেমিক্স, রিসার্চ, স্কিলস হাইলাইট করুন (১-২ পেজ)।
- স্টেটমেন্ট অফ পারপাস (SOP)/কভার লেটার: কেন তাদের ল্যাব, আপনার ফিটনেস ও রিসার্চ ইন্টারেস্ট ব্যাখ্যা করুন (প্রত্যেক প্রফেসরের জন্য কাস্টমাইজ করুন)।
- ট্রান্সক্রিপ্ট ও ডিপ্লোমা: বাংলাদেশী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সার্টিফাইড কপি।
- রিসার্চ প্রপোজাল: ১-২ পেজ (পিএইচডির জন্য; প্রফেসরের কাজের সাথে মিল রাখুন)।
- রেকমেন্ডেশন লেটার: ২-৩টি (প্রথমে অপশনাল)।
- ভাষার প্রুফ।
- সব PDF-এ স্ক্যান করুন; ফাইল ২MB-এর নিচে রাখুন।
৩. প্রফেসরদের কন্টাক্ট করুন (চলমান, ইনটেকের ৬-১২ মাস আগে শুরু করুন):
- ইমেইল পাঠান: সাবজেক্ট লাইন – “PhD Position Interest in [আপনার ফিল্ড] - Bangladeshi Applicant”।
- বডিতে: নিজের পরিচয়, রিসার্চ ম্যাচ, ডকুমেন্টস অ্যাটাচ করুন। উল্লেখ করুন “seeking professor-funded scholarship for [Master’s/PhD]”।
- ১-২ সপ্তাহ পর রিপ্লাই না পেলে ফলো-আপ করুন। ১০০+ ইমেইল পাঠানো স্বাভাবিক।
- আগ্রহ দেখালে Zoom/Skype-এ ইন্টারভিউ হতে পারে। ফান্ডিং ডিটেইলস (স্টাইপেন্ড) আলোচনা করুন।
- “প্রি-অ্যাকসেপ্টেন্স” বা ফান্ডিং কমিটমেন্ট লেটার নিন।
৪. বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করুন (ডেডলাইন: ফলের জন্য মার্চ-মে, স্প্রিংয়ের জন্য সেপ্টেম্বর):
- প্রফেসর সম্মতি পেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল অ্যাডমিশন পোর্টালে আবেদন করুন (যেমন SNU-এর অনলাইন সিস্টেম)।
- আবেদনে প্রফেসরের রেকমেন্ডেশন বা ল্যাব অ্যাফিলিয়েশন জমা দিন।
- আবেদন ফি: ৭০,০০০–১৫০,০০০ ওয়ান (BDT ৬,০০০–১৩,০০০); ফান্ডেড অ্যাপ্লিক্যান্টদের কিছু ক্ষেত্রে ওয়েভার হয়।
- ২০২৬ ফল ইনটেকের জন্য ডেডলাইন মার্চ-মে ২০২৬; বিশ্ববিদ্যালয় সাইট চেক করুন।
৫. ডিসিশন ও ভিসা অপেক্ষা করুন (২-৪ মাস):
- বিশ্ববিদ্যালয় রিভিউ করে; প্রফেসরের সাপোর্ট থাকলে অ্যাডমিশন নিশ্চিত হয়।
- অফার লেটার পান ফান্ডিং ডিটেইলস সহ।
- ঢাকায় কোরিয়ান এম্বাসিতে D-2 ভিসা আবেদন করুন: ফান্ডিং প্রুফ, অ্যাডমিশন লেটার, ফাইন্যান্সিয়াল ডক (আংশিক ফান্ডিং হলে) জমা দিন।
- কোরিয়ায় পৌঁছে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করুন।
৬. পোস্ট-অ্যারাইভাল:
- ওরিয়েন্টেশন অ্যাটেন্ড করুন; অ্যালিয়েন রেজিস্ট্রেশন করুন।
- এনরোলমেন্টের পর ফান্ডিং শুরু হয়; পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে রিনিউ হয় (GPA ৩.০+)।
মূল সুবিধাসমূহ
- আর্থিক কভারেজ: সম্পূর্ণ টিউশন ওয়েভার (বছরে ১০-২০ মিলিয়ন ওয়ান), মাসিক লিভিং স্টাইপেন্ড (ডর্ম/অ্যাপার্টমেন্টে থাকা-খাওয়া কভার করে), হেলথ ইনস্যুরেন্স, কখনো এয়ারফেয়ার বা সেটেলমেন্ট অ্যালাউয়েন্স।
- রিসার্চ সুযোগ: কাটিং-এজ প্রজেক্টে কাজ, পেপার পাবলিশ, গ্লোবাল নেটওয়ার্কিং।
- ক্যারিয়ার বুস্ট: কোরিয়ান পিএইচডি একাডেমিয়া, ইন্ডাস্ট্রি (Samsung, Hyundai) বা বাংলাদেশে ফিরে চাকরির সুযোগ দেয়।
- কালচারাল সুবিধা: অনেক প্রোগ্রামে ফ্রি কোরিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাস; ভাইব্রেন্ট স্টুডেন্ট লাইফ।
বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য সফলতার টিপস
- আগে থেকে শুরু করুন: ২০২৬ ইনটেকের জন্য এখনই (জানুয়ারি ২০২৬) প্রফেসর কন্টাক্ট শুরু করুন।
- ইমেইল কাস্টমাইজ করুন: জেনেরিক মেসেজ এড়ান; প্রফেসরের সাম্প্রতিক পেপার রেফার করুন।
- প্রোফাইল শক্তিশালী করুন: বাংলাদেশে ইন্টার্নশিপ বা থিসিস দিয়ে রিসার্চ অভিজ্ঞতা নিন।
- নেটওয়ার্কিং: ফেসবুক গ্রুপ যেমন “Study in South Korea with Professor Fund for Bangladeshi Students” বা “GKS Scholarship” জয়েন করুন; টিপস ও প্রফেসর লিস্ট পাবেন।
- বিকল্প ফান্ডিং: প্রফেসর ফান্ড না পেলে GKS (বাংলাদেশের এম্বাসি ট্র্যাক) বা বিশ্ববিদ্যালয় স্কলারশিপ একসাথে আবেদন করুন।
- সাধারণ চ্যালেঞ্জ: উচ্চ প্রতিযোগিতা; ভাষার বাধা—ইংরেজি/কোরিয়ান উন্নত করুন। প্রাথমিক খরচ (ভিসা, ট্রাভেল: BDT ১-২ লাখ) বাজেট করুন।
- রিসোর্স:
- Study in Korea পোর্টাল: www.studyinkorea.go.kr (স্কলারশিপ সার্চ করুন)।
- বিশ্ববিদ্যালয় সাইট: en.snu.ac.kr, kaist.ac.kr।
- ঢাকায় কোরিয়ান এম্বাসি বা সিউলে বাংলাদেশী এম্বাসি থেকে পরামর্শ নিন।
- ইউটিউব: “Professor funded scholarship Korea” সার্চ করে ভিডিও গাইড দেখুন।
এই পথ অনেক বাংলাদেশী শিক্ষার্থীকে টিউশন-ফ্রি কোরিয়ায় পড়ার সুযোগ দিয়েছে।
.png)
No comments:
Post a Comment